যুগবীক্ষণ ডিজিটাল নিউজ ব্যুরো:
Author : Dr Nirmal Dey ● Digital & data arrangement :Tista Mondal ● Editing : Laboni Dey

কলকাতা ,৩ নভেম্বর : সালটা ১৯৮৮। মুম্বাইতে চলছিল হ্যারিস শিল্ড ইন্টার স্কুল টুর্নামেন্ট । ১৩ বছরের দুটো ছেলে, শচীন টেন্ডুলকার এবং বিনোদ কাম্বলি সারদাশ্রম বিদ্যামন্দিরের হয়ে তৃতীয় উইকেট জুটিতে ৬৬৪ রানের পার্টনারশিপ গড়ে চারদিকে হৈ-চৈ ফেলে দিয়েছিলেন। তখনকার সময়ের দুই অখ্যাত ছেলের স্কুল ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রানের জুটির পর হঠাৎ করেই দুজনের নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো।ঠিক ওই জুটির সময়েই স্ট্যান্ড থেকে খানিক দূরে ১৩ বছরের আরেকটা ছেলে ওয়ার্মিং করছিলেন, নেট প্র্যাকটিস করছিলেন। ব্যাট-প্যাড পড়ে রেডি হয়ে দুই দিন অপেক্ষা করছিলেন পরবর্তী ব্যাটসম্যান হিসেবে ব্যাট করতে নামার জন্য। কিন্তু তার সেই ‘অপেক্ষার’ পালা শেষ হয়নি আর, ব্যাটিংয়েও নামা হয়নি সেই ম্যাচে। দল যখন ইনিংস ঘোষণা করছে, তখনও যে শচীন-কাম্বলি অপরাজিত!ক্যারিয়ার জুড়েই অপেক্ষার সাথে বন্ধুতা করা সেই ছেলেটি আর কেউ নন, আজকের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন মহিলা ক্রিকেট দলের কোচ অমল মজুমদার।
চারিদিকে এখন ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের জয় জয়কার ,আর তা হবে নাই বা কেন?দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় পর আবার বিশ্বকাপ ট্রফি ফিরল ভারতের ঘরে, আর এই স্বর্ণালী মুহূর্তটির পুনরাবৃত্তি ঘটালেন হরমনপ্রীত এর নেতৃত্বে ভারতীয় ক্রিকেট মহিলা দল । এযে ঐতিহাসিক জয় গোটা ভারতীয়র। কিন্তু প্রশ্ন হল এই জয়ের নেপথ্যের নায়ক কে ? মানুষটি অবশ্যই ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের প্রধান কোচ অমল মজুমদার, হ্যা সেই চির নির্বিবাদী, আপাদমস্তক ভদ্র সভ্য শান্ত কিন্তু লক্ষ্যে অবিচল সুদর্শন অমল অনিল মজুমদার।
অত্যন্ত প্রতিভাবান ডান হাতি ব্যাটসম্যান হওয়া সত্বেও ভারতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার সুযোগ পাননি তিনি। মুম্বাই এবং আসামের হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে ১১ হাজারের বেশি রান করে মুম্বাই দলকে রঞ্জি ট্রফি জেতাতে সাহায্য করেছিলেন। সেই সময় তেন্ডুলকর এবং কাম্বলির মত কিংবদন্তিদের ভিড়ে চাপা পড়ে জাতীয় দলে খেলার সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি তাঁর ।কিন্তু নিজে না পারলেও জেতার লক্ষ্যটা সবসময়ই স্থির ছিল তাঁর।
২০২৩ সালের অক্টোবর। ভারতীয় মহিলা দলের প্রধান কোচ হিসেবে নিযুক্ত হন অমল মজুমদার। তিনি যখন প্রথমে দলের ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন তখন অনেকটাই অগোছালো ছিল ভারতের মহিলা ক্রিকেট দল। অনেক বাধা বিপত্তি,সমালোচনা মেনে নিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন ভারতীয় মহিলা দলকে।তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন শুধু নয় , স্বপ্ন দেখতে পেরেছিলেন বিশ্বজয়ের। অক্লান্ত পরিসম করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে দিনের পর দিন দলকে নিয়ে। আর তারই প্রতিফলন হিসেবে অমলের নেতৃত্বে ২০২৫ সালে ওডিআই মহিলা বিশ্বকাপ জিতেছেন ভারতীয় মেয়েরা।অধিনায়ক হারমোনপ্রীত সহ দলের প্রত্যেক সদস্যই আমলকে নিয়ে উচ্ছসিত।

প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও তাতে পরিশ্রমের জ্বালানি দিতে পারেন নি বলে কত প্রতিভাবান অকালে হারিয়ে গিয়েছেন ! কত প্রতিভা অঙ্কুরেই ঝরে গাছে । অমলকে কিন্তু সেই দলে ফেলতে পারা যাবে না । অমল নিজেকে নিংড়ে দিয়ে নিজের চেষ্টায় গোটা ক্যারিয়ারেই অপেক্ষা করে গেছেন।এক রঞ্জি হিরো নয় ।তার নামের পাশেও যুক্ত হওয়ার কথা ছিল ‘লিভিং লেজেন্ড’, কিংবদন্তি ইত্যাদি শব্দমালা। ভাগ্যের পরিহাস আর ভুল যুগের সারথি ছিলেন বলে তার নামের পাশে শুধুই দীর্ঘশ্বাস আর আক্ষেপ ঝরে। কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার আর প্রতিভার নিদারুণ অপচয় করা বিনোদ কাম্বলির সাথে একই স্কুলের ক্লাসমেট ছিলেন তিনি। ক্রিকেটগুরু হিসেবেও পেয়েছিলেন শচীন-কাম্বলির গুরু রমাকান্ত আচরেকারকে।কিন্তু স্রেফ সময়ের মারপ্যাঁচে বাঁধা পড়ে গিয়েছিলেন বলেই নীল রঙের জার্সিটা গায়ে জড়াতে পারেননি অমল।
সফল তো তারাই, যারা চেষ্টার দ্বার খোলা রেখে প্রতিনিয়ত স্বপ্নকে তাড়া করে। অমল মজুমদার তাদেরই একজন ছিলেন।সকলেই তাকে দ্বিতীয় শচীন বলতেন, নিজে কখনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পাননি কিন্তু তার অধরা স্বপ্ন যেন পূরণ হয়ে গেল তার অতি স্বপ্নে গড়ে তোলা ভারতীয় মহিলা বীরাঙ্গনা দের মধ্যে দিয়ে। ক্রিকেটের এক অমলের স্বপ্ন পূরণ করলেন এক দ্রোণাচার্য অমল। ●