পুজোর প্রধান ফল ডিম্ ! মহা জাগ্রত এই দেবীর পুজোর পিছনে লুকিয়ে আছে কোন অবাক করা ঐতিহাসিক কাহিনী !

কলকাতা,১৬ জানুয়ারি :

আমাদের দেশ তথা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে পূজিত হয়ে থাকেন সনাতনী হিন্দুদের ৩৩ কোটি দেব-দেবী। এই সকল দেব-দেবীর পূজাকে ঘিরে রয়েছে রকমারি নিয়ম ,প্রথা এবং রীতি রেওয়াজ।কিন্তু তাই বলে পুজোর ফল অর্থাৎ প্রধান উপকরণ ডিম্ ! এ একদমই অবিশ্বাস্যই বটে !সত্যিই অবাক হওয়ার মতনই বৈকি ।তবে শুনে একেবারে হতবাক হলেও এটি বাস্তব সত্য !

সাধারণত হিন্দু ধর্মে দেব-দেবীরা ফল-মূল, ধূপ-ধুনার, মতো উপকরণ দিয়ে পূজিত হয়ে থাকে, কিন্তু ডিম দিয়ে পুজো সত্যিই এক অভূতপূর্ব বটে! দক্ষিণ কলকাতার বাঘাযতীন সংলগ্ন শ্রীকলোনি বারোভূত দ্বাদশ অবতার মন্দিরে এমনটাই প্রথা এবং রীতি মেনে বহু বছর ধরে পূজিত হয়ে আসছেন বুড়ো-বুড়ি মা ওরফে বনদুর্গা বা বন বিবি মা। প্রতিবছর মকর সংক্রান্তির দিন প্রথা-রীতি মেনে মহাসড়ম্বরে ধুমধাম করে পূজিত হয়ে থাকেন বুড়ো-বুড়ি মা। বুড়ো-বুড়ি মা ওরফে বনদুর্গা মায়ের এই ডিম দিয়ে পূজার পিছনে রয়েছে এক ঐতিহাসিক কাহিনী।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রুহিতপুর গ্রামে সর্বপ্রথম ডিম দিয়ে শুরু হয় এই বুড়ি মায়ের পূজা। লোকমুখে প্রচলিত আছে, বৃদ্ধার বেশে একদিন বনবিবি মা রুহিতপুর গ্রামের এক ব্যক্তির বাড়ি যান, সেখানে গিয়ে খিদের কথা তাদের জানাতে সেই সময় গ্রামের বাড়িতে মজুত হাঁসের ডিম দিয়ে খাবার দেওয়া হয় বনদুর্গা মাকে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, পূর্বে প্রতিটি গ্রামের বাড়িতেই সেই সময় হাঁস পালন করা হতো, ফলে প্রতিটি বাড়িতেই হাঁসের ডিমের একপ্রকার বেশ চল ছিল। এরপরে থেকেই ছদ্মবেশে আসা বনবিবি মা এই গ্রামে

বুড়ো-বুড়ি রূপে পূজিত হন। দেশভাগের পর তাদের বংশধররা এপার বাংলার বাঘাযতীনে এসে আশ্রয় নেওয়ার পর এখানেই তাদের বংশধরদের হাত ধরে শুরু হয় বুড়ো-বুড়ি মায়ের পূজা। এই পূজার মূল ,উপকরণটি হল হাঁসের ডিম অথবা পায়রার ডিম। দীর্ঘ ৭৬ বছর ধরে প্রথা- রীতি মেনে মকর সংক্রান্তির দিন মহাসাড়ম্বরে বুড়ো-বুড়ি রূপে পূজিত হয়ে থাকেন বনদুর্গা মা। সাধারণ প্রতিমা মূর্তির থেকে একেবারে ভিন্ন রূপে এখানে দেখা যায় বনদুর্গা মাকে। বৃদ্ধা বেশে দেখা যায় মায়ের কোলে এক শিশুকে এবং মায়ের বাম এবং ডান দিক মিলিয়ে দুপাশে দুটি শিশুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
কথিত আছে, যে সমস্ত মায়েদের সন্তান সন্তাদি নেই এবং যেসব মায়েদের সন্তান রয়েছে তাঁরা তাঁদের সন্তানদের মঙ্গল কামনার্থে হাঁসের ডিম দিয়ে বুড়ি মায়ের কাছে মানত করলে মা তাদের সন্তানদের রক্ষা করেন, মঙ্গল করেন, মায়েদের মনস্কামনা পূরণ করে থাকেন বলে । তাই বহু দূর-দূরান্ত থেকে মকর সংক্রান্তির দিন বহু মায়েরা তাদের সন্তানদের মঙ্গলার্থে পুজো দিতে আসেন বুড়িমা, (বনদুর্গা) মায়ের কাছে। সকাল থেকে শুরু হয়ে যায় মায়ের পূজো তা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত, বহু জাগ্রত এই মা। মায়ের পূজা কে কেন্দ্র করে বহু সাধু সন্ন্যাসীরা আসেন এখানে।
শুধু পূজাই নয় এর পাশাপাশি বুড়ি মায়ের পূজাকে কেন্দ্র করে দশ দিনব্যাপী এক বিরাট মেলারও আয়োজন হয়ে থাকে এখানে, যেটি মূলত বারোভূতের মেলা নামে বিশেষভাবে পরিচিত। মকর সংক্রান্তির দিন থেকে শুরু করে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতিবছর চলে এই বারোভূতের মেলা। হরেক রকম খাবারের দোকান থেকে শুরু করে ঘর সাজানোর জিনিস, মহিলাদের সাজ-সজ্জা, বাচ্চাদের খেলনা, এছাড়াও বিভিন্ন পিঠের দোকান সহ হরেক রকম স্টলের সম্ভার নিয়ে চলে এই মেলা। এর পাশাপাশি বাচ্চা এবং বড়দের উভয়ের জন্য এই মেলাতে রয়েছে বিভিন্ন রকম রাইডসও। সব মিলিয়ে মানুষের কোলাহলে এই দশ দিন একেবারে জমজমাট হয়ে ওঠে সমগ্র পূজা এবং মেলা প্রাঙ্গণ।●

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *