রাজনীতির চাণক্য নাকি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ! মুকুল রায়কে কিভাবে মনে রাখবে রাজনৈতিক ময়দান ! : ভরা বসন্তে ঝড়া মুকুলকে ফিরে দেখা

●কলকাতা, ২৩ ফেব্রুয়ারি : অকালে ,অন্তরাল থেকে চলে গেলেন তিনি! তৃণমূলের সবুজ বাগানে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা ও পরিপক্কতার মুকুল ফুটিয়েছিলেন তিনি ! রাজনীতির ময়দানে তথাকথিত সুক্ষ কূটনৈতিক বিষয়েও বৈকি! হ্যাঁ তিনি মুকুল রায়। রাজনীতির ময়দানে বর্ষিয়ান এই নেতা দীর্ঘদিন ধরেই কিডনি সহ একাধিক শারীরিক সমস্যার কারণে অসুস্থ ছিলেন। প্রায়ই হাসপাতালে ভর্তি করতে হতো তাঁকে। কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন রবিবার গভীর রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মুকুল। বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।
আজ মৃত্যুর খবর পেয়েই তাঁর বাড়ির সামনে ভিড় জমাতে থাকেন তৃণমূলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা। দুপুরের মধ্যে হাসপাতাল থেকে তাঁর বাড়ি কাঁচরাপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হবে মরদেহ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দোপাধ্যায় সহ তৃণমূলের প্রথম সারির নেতা নেতৃবৃন্দ তার মরদেহে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। তাঁর এই প্রয়াণে রাজনৈতিক মহলে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

কে এই মুকুল রায় ? কিভাবে তার রাজনৈতিক ময়দানে উত্থান ? সে এক চমকপ্রদ ইতিহাস ! অনেকেরই হয়ত জানা ,আবার অনেকেরই অজানা বৈকি ! কংগ্রেসের হাত ধরে রাজনীতিতে পা রেখেছিলেন মুকুল। পরবর্তীতে তৃণমূলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। রাজ্যসভার সদস্য পদের দায়িত্বও সামনে ছিলেন মুকুল। অসাধারণ সাংগঠনিক নেতা ছিলেন তিনি। দলের প্রতি এতটাই অনুগত্যতা ছিল যে, তৃণমূলের পার্টি অফিসেই সপরিবারে থাকতেন তিনি। প্রতিটা বুথ স্তরের সমস্ত খবরই থাকতো তার নখদর্পণে। বাংলার রাজনীতিতে সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মুকুল রায়ের দক্ষতা আলোচনায় এসেছে বহুবার। বিশেষত তৃণমূল কংগ্রেসের শুরুর দিনগুলোতে জেলা থেকে বুথ স্তর পর্যন্ত সংগঠন বিস্তারে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে , তিনি ময়দানে কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা এক নেতা, যিনি কাগজ-কলমে নয়, বাস্তব সংগঠনে বিশ্বাস করতেন । এক কথায় দলের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড ছিলেন মুকুল রায়। অনেক রাজনৈতিক মহলে মুকুল রায়কে নির্বাচনী রণকৌশলের বিশেষজ্ঞ বলা হয় । ভোটের আগে প্রার্থী নির্বাচন, জোটের হিসাব, বিরধী শক্তির দুর্বলতা চিহ্নিত করা এসব ক্ষেত্রে তার বিশ্লেষণ ক্ষমতা ছিল উল্লেখযোগ্য । বিশেষজ্ঞদের মতে , তিনি ভোটের অঙ্ক কষতে পারতেন খুব সূক্ষ্মভাবে । কোন অঞ্চলে কোন ইস্যু কাজ করবে, কোথায় কাকে সামনে আনা উচিত এইসব ক্ষুরধার সিদ্ধান্তে তার প্রভাব ছিল স্পষ্ট। তার রাজনৈতিক পদ চলার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
পরবর্তী সময় তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা যেটি ছিল তা হল, সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারি এবং নারদা স্টিং অপারেশন। সিবিআই যখন মুকুল রায় কে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে তখন দলের ভিতরে গুঞ্জন শুরু হয় যে, তিনি নিজেকে বাঁচাতে বিজেপির সাথে যোগ রাখছেন । মুকুল রায়ের সাথে দূরত্ব তৈরীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কারণ ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এর রাজনীতিতে অভিষেক এবং দ্রুত ক্ষমতা বৃদ্ধি। মুকুল রায় নিজেকে দলের অঘোষিত দুই নম্বর নেতা মনে করতেন । কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন অভিষেককে তৃণমূলের যুব-র দায়িত্ব দিয়ে আগামীর নেতা হিসেবে তুলে ধরলেন তখন মুকুল রায় কোণ ঠাসাবোধ করতে থাকেন । আগে দলের সমস্ত সংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিতেন মুকুল রায়, কিন্তু অভিষেকের প্রভাবে তার সেই একাধিপত্য খর্ব হয়। এক সময় তৃণমূলের টিকিট বন্ঠন থেকে শুরু করে জেলা স্তরের সংগঠন সবই ছিল মুকুল রায়ের নিয়ন্ত্রণে । ২০১৪ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে তাঁর জায়গা কেড়ে নেওয়া শুরু হয়। তাঁকে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় । জেলা সফর এবং বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এর ক্ষেত্রে তাঁকে আর আগের মতো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছিল না । এরপর মুকুল রায় যখন দেখলেন দলে তাঁর জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, তখন তিনি বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেন। তিনি তৎকালীন বিজেপি নেতাদের সাথে যোগাযোগ বাড়াতে থাকেন ।
এরপর ২০১৭ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান করেন মুকুল। তৃণমূলের এই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ২০২১ সালে বিজেপি থেকে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে ভোটে দাঁড়িয়ে ছিলেন, এবং সেখানে জয়লাভ করে বিধায়ক হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এরপর ২০২১ সালেই ফের তৃণমূলে ফিরে আসেন মুকুল। তবে বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেননি তিনি। ফলে তৃণমূলে যোগ দিলেও খাতায় কলমে বিজেপি বিধায়ক হয়েই রয়েগিয়েছিলেন মুকুল। তাঁকে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান ও করা হয়েছিল। তাঁর বিধায়ক পদ খারিজের মামলা গড়িয়েছিল আদালত পর্যন্তও। কলকাতা হাইকোর্ট খারিজের রায় দিলেও সেই রায়ের ওপর অন্তরবর্তী স্থগিতাদেশ দিয়েছিল শীর্ষ আদালত।

    রাজনীতির বাইরে মুকুল রায়ের ব্যক্তিগত জীবন ছিল তুলনামূলকভাবে অনেকটাই আড়ালে। পরিবার ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং স্বাস্থ্যের বিষয়েও তিনি আলোচনায় এসেছেন বহুবার। বিশেষত যে বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন তুলেছিল তা হলো, তাঁর শারীরিক অসুস্থতার খবর।অবশেষে চলে গেলেন বংগো রাজনীতির কঠিন সময়ে বেশ কিছুদিন  রাজনীতির জটিল মারপ্যাঁচের  থেকে বহু দূরে  থাকা একজন আবেগপ্রবণ মানুষ, যিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় নানা উত্থান- পতনের সাক্ষী থেকেছেন।ভরা বসন্তে ঝড়ে  গেলেন মুকুল।পরে রইলো তার একসময়ের সর্বক্ষণের সঙ্গী সেই রাজনৈতিক ময়দান এবং অসংখ্য অনুরাগী।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *