মেঘে ঢাকা তারা : তৃণমূলের ২৬ এর প্রার্থী তালিকায় নেই কোনো নতুন তারকা – কোন পরিবর্তনের ইঙ্গিত !

●কলকাতা,২২ মার্চ :রাজ্যে ভোট আসন্ন।ইতিমধ্যেই ঘোষিত হয়ে গেছে ভোটের দিনক্ষণ। আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দু দফায় হতে চলেছে ২৬ এর বিধানসভা ভোট।রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস প্রকাশ করেছে তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকা। দেড় দশকেরও বেশি সময়ে এই প্রথম বড় কোনও নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় নেই কোনও তথাকথিত ‘তারকা চমক’। বিধানসভা নির্বাচনের জন্য সম্প্রতি রাজ্যের ২৯১টি কেন্দ্রের যে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই তালিকায় নতুন কোনও তারকার নাম নেই। বরং বারাসত এবং উত্তরপাড়ায় দুই তলায় তারকা চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী এবং কাঞ্চন মল্লিককে টিকিট দেওয়া হয়নি।বরং এমন অনেক নতুন মুখকে প্রার্থী করা হয়েছে, যাঁরা পুরদস্তুর ‘রাজনৈতিক’।

বিগত বেশ কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন মহল থেকে নানা টলি তারকার নাম তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে হাওয়ায় ভাসছিল।কিন্তু তা যে নিছকই গুজব তা প্রমান করে দিয়েছে গত মঙ্গলবার তৃণমূলের প্রার্থিতালিকা। ঘটনাপ্রবাহ বলছে, যাঁদের নিয়ে জল্পনা-কল্পনা ছিল,সেটা দৃঢ় হয়েছিল এবছর ২১ ফেব্রুয়ারি যখন তাদের ‘বঙ্গসম্মান’ দেওয়া হয়েছে। কিন্রু বাস্তবে ঘটল অন্যকিছু ।

নতুন কোনও তথাকথিত ‘তারকা’ বা ‘খ্যাতনামী’ যেমন তৃণমূলের প্রার্থী হননি, তেমনই পুরনো মুখেদের কয়েক জনের আসন বদলে দেওয়া হয়েছে। গত বার পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুর থেকে জয়ী অভিনেতা সোহম চক্রবর্তীকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে নদিয়ার করিমপুরে। আবার প্রাক্তন ফুটবলার বিদেশ বসুকে প্রার্থী করা হয়েছে হুগলির সপ্তগ্রামে। বাদ পড়েছেন প্রাক্তন ক্রিকেটার তথা মন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি। তবে অভিনেত্রী লাভলি মৈত্র, সঙ্গীতশিল্পী অদিতি মুন্সিকে তাঁদের পুরনো কেন্দ্রেই প্রার্থী করা হয়েছে । প্রাক্তন ক্রিকেটার তুফানগঞ্জের ভূমিপুত্র শিবশঙ্কর পালকে সেখানেই প্রার্থী করা হয়েছে। ক্রীড়াবিদ স্বপ্না বর্মণকে প্রার্থী করা হয়েছে তাঁর নিজের এলাকা জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জে ।
তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরেই উত্তরপাড়া কেন্দ্রে দেখা গেছে বড় চমক। অভিনেতা প্রার্থী কাঞ্চন মল্লিক কে সরিয়ে ২৬ এর ভোটে প্রার্থী করা হয়েছে শীর্ষাণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় কে। গত কয়েক বছর ধরে উত্তরপাড়ার প্রাক্তন বিধায়ক কাঞ্চন মল্লিককে ঘিরে একাধিক বিতর্ক ও অভিযোগ সামনে এসেছিল। নির্বাচনী এলাকায় অনুপস্থিত ও ব্যক্তিগত জীবন কে কেন্দ্র করে সমালোচনা বাড়তে থাকায় কাঞ্চনের বদলি কার্যত নিশ্চিতই হয়ে পড়েছিল। অপরদিকে, ইতিমধ্যেই কিছুদিন আগেই রাজ্যের অর্থপ্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের হাত ধরে তৃণমূলপন্থী আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে, কলকাতা হাইকোর্টের তরুণ আইনজীবী শীর্ষাণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় যোগদান করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসে। এবার তারকাকে সরিয়ে তরুণ এই আইনজীবীকেই উত্তরপাড়ারার প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়েছে তৃণমূল। এবিষয়ে প্রাক্তন তারকা বিধায়ক কাঞ্চন মল্লিক জানিয়েছেন, “মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধয়েই দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। একজন শিল্পীকে শিল্পীর সম্মান দিয়ে বিধায়ক হিসেবে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।”

টিকিট কনফার্ম হলো না চিরঞ্জিতেরও. বারাসাতের বিধায়ক চিরঞ্জিত চক্রবর্তী আগেই রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হওয়ার আগেই কিছু তারকার ২৬- এর ভোটের টিকিট না মেলার গুঞ্জন উঠে আসছিল। এবার এই গুঞ্জনেই সিলমোহর পড়লো। তৃণমূলের বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী তালিকায় নাম নেই তারকা বিধায়ক চিরঞ্জিত চক্রবর্তীরও। চিরঞ্জিতের পরিবর্তে তৃণমূল ২৬-এর ব্যালটযুদ্ধে বিধায়ক হিসেবে বেছে নিয়েছে সব্যসাচী দত্তকে।

তৃণমূলের তারকা প্রার্থী কালচারের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে মমতা বন্দোপাধ্যায় স্বয়ং শতাব্দী ও প্রয়াত তাপস পালকে প্রার্থী করে তৃণমূলে ‘তারকা সংস্কৃতি’ শুরু করেছিলেন । ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘিতে তদানীন্তন মন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে দেবশ্রী রায়কে প্রার্থী করে চমক দিয়েছিলেন তৃণমূলনেত্রী। ‘পরিবর্তনের হাওয়ায়’ ডাকসাইটে বাম প্রার্থী কান্তিকে হারিয়েও দিয়েছিলেন দেবশ্রী। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দেব, সন্ধ্যা রায়, মুনমুন সেনকে প্রার্থী করেছিলেন মমতা। তিন জনেই জিতেছিলেন। গায়ক ইন্দ্রনীল সেন হেরে গিয়েছিলেন বহরমপুরে অধীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে। পরে ২০১৬ সালে তাঁকে চন্দননগর বিধানসভায় প্রার্থী করা হয়। জিতে পর পর দু’বার তিনি মন্ত্রী হয়েছেন। এ বারও তিনি সেখানেই প্রার্থী। ২০১৬ সালেই প্রথম বার সোহম তৃণমূল প্রার্থী হিসাবে লড়েছিলেন বাঁকুড়া থেকে। কিন্তু তাঁকে সে বার হারতে হয়েছিল। আবার প্রাক্তন ক্রিকেটার লক্ষ্মীরতন শুক্ল জিতে মন্ত্রী হয়েছিলেন সে বারই। প্রাক্তন ফুটবলার রহিম নবি প্রার্থী হয়েছিলেন পাণ্ডুয়ায়। কিন্তু তিনি হেরে যান। ২০১৯ সালের লোকসভায় তৃণমূলের প্রার্থিতালিকায় ‘চমক’ ছিলেন বসিরহাটে নুসরত এবং যাদবপুরে মিমি। ২০২১ সালের বিধানসভায় জুন, কৌশানী মুখোপাধ্যায়, লাভলি, কাঞ্চন, অদিতিদের প্রার্থী করেছিল তৃণমূল।

তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড অভিষেক বন্দোপাধ্যায় বরাবরই তথাকথিত ‘টলিউড তারকা’-দের প্রার্থী করার বিষয়ে নিজের জোরাল অসম্মতি প্রকাশ করেছেন । এর পিছনে একাধিক কারণ। তারকাদের এঁদের মধ্যে সিংহভাগ নিজের কেন্দ্রে সময় দিতে পারেন না। লোকসভা ভোটের সময় অভিনেত্রী মিমি চক্রবর্তী এবং নুসরত জাহানের ক্ষেত্রে সেটা প্রকট হয়েছিল । তাঁরা বাদ পড়লেও নতুন তারকা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। খ্যাতনামীদের মধ্যে কেউ রাজনীতিতে আসতেই পারেন কিন্তু তাকে প্রয়োজনীয় সময় দিতে হবে। দলে এই বার্তাই মূলত দিতে চেয়েছেন অভিষেক। যে কারণে শতাব্দী রায় বা সায়নী ঘোষের টিকিট পেতে অসুবিধা হয়নি।বাস্তবে দেখা যায় একজন রাজনীতিক জনপ্রতিনিধি তার কেন্দ্রে যে পরিষেবা দেবেন, তারকাদের থেকে সেটা পাওয়া যায় না। আবার এ-ও ঠিক যে, তারকা হওয়া সত্ত্বেও তৃণমূলে অনেকেই মন দিয়ে রাজনীতি করছেন। শতাব্দীর পরে তেমন উদাহরণ জুন মালিয়া যাঁকে বিধানসভা থেকে তুলে নিয়ে লোকসভায় পাঠানো হয়েছে সেই কারণে ।

২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের পর থেকেই তৃণমূলের সংগঠনের বিষয়টি মূলত দেখেন অভিষেক।তখন থেকেই বস্তুত সাংগঠনিক স্তরে তিনি নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চেয়েছেন । কখনও তা পেরেছেন, কখনও তাঁকে থেমে থাকতে হয়েছে । ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে থেকেই অভিষেক ‘নতুন তৃণমূল’-এর কথা বলছেন। দেড় দশকের বেশি সময় পরে ‘তারকা চমক’ ছাড়া প্রার্থিতালিকা এবং পুরোমাত্রায় রাজনৈতিক নতুন নবীন মুখ তুলে আনাকে সার্বিক ভাবে ‘নতুন’ তৃণমূলের পথে পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ ।তবে এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে তা সময় বলবে বৈকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *