বাম আমলে হারিয়ে গিয়ে রাম আমলে প্রত্যাবর্তন ! শুভেন্দু সরকারের আহ্বানে বাংলায় বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন ! সম্বর্ধনা মঞ্চে অনুষ্ঠানের মাঝে বিপত্তি

কলকাতা : তখন বাম শাসিত বাংলা ! সালটা ২০০৭।তাঁর লেখা বিখ্যাত (বিতর্কিতও বৈকি) ‘দ্বিখন্ডিত’ কে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বাংলা।রাজ্যে তৎকালীন শাসকদলের নির্দেশে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন মৌলবাদী বিরোধী প্রতিবাদী কবি,লেখক তসলিমা নাসরিন।ইতিমধ্যেই বিগত বিশ বছরে বাংলা দিয়ে রাজনীতি থেকে সামাজিক প্রেক্ষাপট -জল গড়িয়েছে বহুদূর। ২০১১ তে সুদীর্ঘ ৩৪ বছরের বাং জামানার অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস দল। এরপর ২০২৬ এ বাংলায় আবার পালাবদল ঘটে। প্রথমবার বাংলায় বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। আর এই সময়েই বেশ খানিকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই বাংলায় প্রত্যাবর্তন ঘটলো তাঁর !

প্রায় ২০ বছর পর নির্বাসন কাল ঘুচিয়ে তসলিমা নতুন বিজেপি সরকারের আহ্বানে কলকাতায় ফিরেছিলেন শুক্রবার। এরপরের দিন তথা শনিবার রবীন্দ্রসদনে তাঁর প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এদিন তাসলিমাকে সংবর্ধনা জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে এদিন মুখ্যমন্ত্রী জানান,”সুরক্ষিত পশ্চিমবঙ্গে আপনাকে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব মুখ্যমন্ত্রীর। আপনি যতবার ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা আসবেন কথা বলবেন।” মুঞখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে সংবর্ধনার পর তাসলিমা জানান,”ওর এই উদারতার জন্য আমি কৃতজ্ঞ এটা আমার জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল।” পাশাপাশি তিনি দুঃখ প্রকাশ করে আরও বলেন,”একজন লেখককে তার ভাষার শহরে আসতে পুলিশের পাহারার প্রয়োজন হওয়াটাই আমাদের কাছে সত্যি বেদনাদায়ক। আমি এমন একটা দিনের স্বপ্ন দেখি যেদিন কোনও লেখককে পুলিশের পাহারায় চলতে হবে না। ভিন্নমত পোষণের জন্য কাউকে দেশ ছাড়তে হবে না।”

সম্বর্ধনা মঞ্চ থেকে লেখিকাকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বার্তা

নতুন সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাসলিমা বলেন, “কোনও ভাল কাজের স্বীকৃতি দিতে দলীয় আনুগত্যের প্রয়োজন নেই। আমি কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে এখানে কথা বলতে আসিনি। কাউকে পরাজিত করতে আসিনি।”লেখিকার মতে, তার এই ফিরে আসা প্রমাণ করে নিষেধাজ্ঞা, ভয় কখনই চিরস্থায়ী নয়। “বন্ধ দরজাও চিরকাল বন্ধ থাকে না।” বলে এদিন অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে জানান তিনি। কলকাতা বিমানবন্দরে পা রাখতেই তাঁর সঙ্গে সব সময় ছিল পুলিশের বাড়তি নিরাপত্তা। যে কোনও রকমের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে তাঁকে নিরাপত্তা বলায়ে ঘিরে ছিল পুলিশ। লেখিকার এই নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করে দেওয়ার জন্য শুভেন্দুকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন তিনি।

কলকাতা সম্পর্কে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেন তাসলিমা। ছোটবেলায় কিভাবে সাহিত্য, গান এবং অচেনা কলকাতা তাঁর মনে ফুটে উঠেছিল সে কথাও ভাগ করে নেন লেখিকা। তার মতে, কাঁটাতার কখনও কবিতা বা সাহিত্য ভাষাকে ভাগ করতে পারে না। প্রথমে তাঁর কলকাতায় আসা তারপরে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে আবার কলকাতায় ফিরে আসা সবকিছুই জানান তিনি। তাসলিমার কথায়,”এক বাংলায় আমার জন্ম আর এক বাংলায় হারিয়ে যাওয়া ঘর খুঁজে পেয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত একজন বাঙালি লেখক এর জন্য দুই বাংলার কোথাও একটা ঘরও রইল না। ইউরোপ আমাকে নাগরিকত্ব ,নিরাপত্তা, আশ্রয় দিয়েছে।” কিন্তু সেই আশ্রয় কখনও ঘর হয়ে উঠতে পারেনি বলে আক্ষেপ লেখিকার।

১৯৯৪ সালে ৮ আগস্ট বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল তাসলিমাকে। সেই আগষ্টেই তিনি ফিরলেন আবার কলকাতায়। এবিষয়ে তিনি জানান, “আগষ্ট আমার জন্মের মাস, আগষ্ট আমার নির্বাসনের মাস। আজ থেকে আগষ্ট আমার প্রত্যাবর্তনের মাসও।”লেখিকার কথায়,”আমাকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল তৎকালীন সরকার। রাতের অন্ধকারে স্বদেশের দরজা আমার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তারপর একের পর এক সরকার এসেছে কিন্তু সেই দরজা আর খোলেনি।”

কলকাতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন,”এখানেই আমি সুখে, স্বস্তিতে ছিলাম। ২০০৭ সালে ২২ নভেম্বর তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার আমাকে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করেছিল। আমি কোনও অপরাধ করিনি। কোনও আদালত আমাকে নির্বাসনের নির্দেশ দেয়নি। তবুও মৌলবাদীদের হুমকির মূল্য দিতে হল আমাকে।” তিনি আরও বলেন,”কোনও মতাদর্শই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয় আমি সব মৌলবাদের বিরোধী। ভারত বাংলাদেশ দুই দেশেরই ধর্মীয় পরিচয় এর ঊর্ধ্বে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির দরকার। তবে তা সংখ্যাগুরুর ধর্মের বিধান নয়। সংবিধান , মানবাধিকার এবং সমানাধিকারের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া নাগরিক আইন।” দীর্ঘ প্রায় কুড়ি বছর পর আবার বাংলায় ফিরে তাঁর আবেগের কথা এদিন ব্যক্ত করেন লেখিকা।

অপরদিকে এদিন তাসলিমা নাসরিনের প্রত্যাবর্তনের এই অনুষ্ঠান মঞ্চে কবি জয় গোস্বামীর মঞ্চে ওঠা নিয়ে সাময়িক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। মঞ্চে কবি জয় গোস্বামীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তাসলিমা। এরপর জয় গোস্বামী নিজের আসন ছেড়ে উঠে যেতেই শুরু হয় দর্শকদের আপত্তি। এরপর তৎক্ষণাৎ জয় গোস্বামী ফিরে বসে পড়েন নিজের আসনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *