থেমে গেল ক্যানভাসে রেখা আর রঙের জাদুকরি খেলা : ফিরে দেখার আলোকে ‘মাস্টার অফ লাইন্স’ যোগেন চৌধুরী

১৯৩৯ সালে অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের এক জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম হলেও দেশভাগের ট্রমা তাঁর জীবন ও শিল্পকে আমূল বদলে দিয়েছিল। দেশভাগের পর সর্বস্ব হারিয়ে সপরিবার কলকাতায় যখন শরণার্থী হিসেবে আসেন, তখন চরম আর্থিক অনটনের মুখোমুখি হতে হয়। আর্ট কলেজে পড়ার দিনগুলিতে তাঁর নিজের কোনো ঘর বা টেবিল ছিল না। রাতে একটি ছোট কেরোসিনের কুপি বা হ্যান্ড ল্যাম্পের আলো ভাগাভাগি করে ভাইবোনদের সাথে পড়াশোনা ও ছবি আঁকার কাজ করতেন তিনি। সেই সময়ের অন্ধকারের অভিজ্ঞতা এবং ক্যানভাস কেনার পয়সা না থাকায় সাধারণ সস্তা কাগজ ও কালো কালির ব্যবহারই পরবর্তীতে তাঁর সিগনেচার স্টাইল বা রেখাজালের জন্ম দেয়।

যোগেন চৌধুরীর আঁকার হাতেখড়ি হয়েছিল তাঁর মায়ের আল্পনা এবং বাবার পৌরাণিক ছবি আঁকা দেখে। কলকাতার বাড়ির দেওয়ালে একটি ময়ূরের ছবি এঁকে তিনি প্রথম চিত্রাঙ্কন করেন। শৈশবে বাংলাদেশে থাকার সময় প্রতিমা শিল্পীদের দুর্গা প্রতিমা তৈরি করা এবং দেবীর চোখ ফুটিয়ে তোলা তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে দেখতেন। শিল্পীদের ফেলে যাওয়া প্রাকৃতিক রং কুড়িয়ে তিনি ছবি আঁকতেন। পরবর্তীকালে তাঁর ক্যানভাসে নারীদের চোখের যে অদ্ভুত ও বিশালাকার রূপ দেখা যেত, তার উৎস ছিল আসলে শৈশবের সেই দুর্গা প্রতিমার চোখ।

খুব কম মানুষই জানেন যে, ১৯৭২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারির কিউরেটর হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি ২০১৪ সালে যখন তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে রাজ্যসভার সাংসদ হন, তখন রাজনীতির অলিন্দেও তাঁর শিল্পীসত্তা সচল ছিল। সংসদ অধিবেশন চলাকালীন তাঁর পকেটে সবসময় স্কেচবুক থাকত। সেখানে বসেই তিনি মনমোহন সিং, সীতারাম ইয়েচুরি এবং স্মৃতি ইরানির মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অবয়ব ক্যানভাসে বন্দি করেছিলেন।

যোগেন চৌধুরী কেবল তুলিই চালাতেন না, তাঁর পকেটে সবসময় একটি ছোট ডিজিটাল ক্যামেরা থাকত। সহ-শিল্পী ও বন্ধুদের অজান্তেই তাঁদের ক্যান্ডিড বা অনাবিল মুহূর্তের ছবি তুলতে ভালোবাসতেন তিনি। পাশাপাশি, তিনি শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক থাকাকালীন এবং পরবর্তীতে ২০১৯ সালে কলকাতায় ‘যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টস’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বহু তরুণ ও অভাবী শিল্পীকে গোপনে আর্থিক সহায়তা করতেন এবং তাঁদের আঁকা ছবি নিজে কিনে তাঁদের উৎসাহিত করতেন।

ক্যানভাস বা কাগজের পটে ছবি আঁকার পর যোগেন চৌধুরী নিচে সম্পূর্ণ নাম লিখতেন না, কেবল লিখতেন ‘যো’। তাঁর মৃত্যুর পর এই অসম্পূর্ণ স্বাক্ষরটি এক গভীর প্রতীকী অর্থ বহন করছে। চিত্রশিল্পের পাশাপাশি তিনি অসাধারণ গদ্য ও কবিতাও লিখতেন। ১৯৯৮ সালে তাঁর লেখা ৪ লাইনের একটি ছোট কবিতা ‘ভালোবাসার কথা’ বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল, যেখানে তিনি লিখেছিলেন কীভাবে হৃদয়ের অনুভূতি হাজার বছরের পুরনো হওয়া সত্ত্বেও চিরকাল নতুন থেকে যায়।
দেশভাগের ক্ষত, সমাজ ও রাজনীতির কদর্যতার বিরুদ্ধে ব্যঙ্গাত্মক রূপক এবং মানুষের জৈবিক বিস্ময়কে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন তিনি। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার একটি বর্ণময় ও সংগ্রামী অধ্যায়ের অবসান ঘটল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *